আমরা আশা করছি, আপনাদের ওয়েবসাইট Islam Q&A (ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব) কে সাপোর্ট দেয়ার জন্য মুক্তহস্তে দান করবেন; যাতে করে ইনশা আল্লাহ্ ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সেবায় আপনাদের ওয়েবসাইট তার পথ চলা অব্যাহত রাখতে পারে।
আমার সাথে আমার মায়ের আচরণ খুবই খারাপ ছিল। এমনকি আমি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। আমি খুবই দ্বিধাগ্রস্ত ও দুর্বল মনের ব্যক্তি হয়ে গেছি। কোনো কাজ ঠিকমত করতে পারি না কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমি বিয়ে করেছি, আল্লাহ আমাকে একটি মেয়ে সন্তান দিয়েছেন। আমার সাথে যা ঘটেছে তা আমি এড়িয়ে যেতে চাই, যাতে করে এই পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতা আমার মেয়ের ক্ষেত্রেও না ঘটে। আমাকে আপনারা কী করার পরামর্শ দিবেন?
আলহামদু লিল্লাহ।.
দুই বছর বয়সে শিশু তার চারপাশের পৃথিবীর প্রতি তার মনোভাব গঠন করতে শুরু করে। কিছু বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানী (Developmental Psychologists) মনে করেন যে আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি হলো সেই মনোভাবগুলোর মধ্যে প্রথম। দ্বিতীয় বছরে এই অনুভূতির তীব্রতা নির্ভর করে শিশু যে ধরনের যত্ন পেয়েছে তার উপর এবং তার শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে পিতামাতার মনোভাবের উপর। এই পর্যায়ে শিশুর বিকাশের লক্ষণগুলো তার স্বাধীনতাচেতা বা স্বায়ত্তশাসিত হওয়ার প্রবণতার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় শিশুর কথা বলার স্বাধীনতা, হাঁটার স্বাধীনতা ও খেলার স্বাধীনতা প্রয়োজন। আর এই সব কিছুই আত্ম-প্রতিষ্ঠার চাহিদার সাথে জড়িত, যা কেবলমাত্র তাকে দেওয়া স্বাধীনতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। এটি ‘পরিপক্কতার মাধ্যমে বিকাশ তত্ত্ব’ দ্বারা সমর্থিত, যা শিশুর স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করা ও তাকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়ার প্রতি আহ্বান করে।
কিছু মেয়ে নিজেদের উপর আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে বড় হয়। যেক্ষেত্রে তারা কম বা বেশি কোনো বিষয়েই নিজেদের উপর নির্ভর করতে পারে না। তারা খুব কমই নিজে থেকে কোনো কাজ শুরু করে এবং সবসময় এমন কাউকে খোঁজে যে তাদেরকে বলবে: ‘এটা করো, ওটা করো।’ যখন তারা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়, তারা থেমে যায়। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কখনও হয়তো সমস্যাকে এড়িয়ে যায়। কখনও কেঁদে ফেলে। এটি পিতামাতার পক্ষ থেকে সন্তানের প্রতি একটি অন্যায়, যা বিভিন্ন কারণে ঘটে:
যে শিশু আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে তার উপর বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়, যেমন:
১. সে স্বাধীনভাবে কোনো কাজ করতে পারে না। যদি তাকে কিছু আনতে বলা হয় এবং যখন সে দেখে যে সেটা তাকে প্রদত্ত বর্ণনা থেকে আলাদা, সে থেমে যায়। সমস্যার মুখে পড়লে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
২. তার মধ্যে নির্বুদ্ধিতার উপস্থিতি এবং সৃজনশীলতার অভাব দেখা দেয়।
৩. তার উপর অর্পিত প্রতিটি কাজ থেকে বিরক্তি ও অস্বস্তি আসে, কারণ সে মনে করে তার কাজের জন্য তাকে সবসময় তিরস্কার করা হবে। সে আগে থেকেই ধরে নেয় যে সে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে পারবে না।
৪. তার ইচ্ছাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, সংকল্প ভেঙে যায় এবং পরাধীনতা, অযথা বশ্যতা, অবহেলা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
৫. উদ্বেগ, হতাশা এবং আক্রমণাত্মক প্রবণতা বা অন্তর্মুখিতা ও একাকীত্বের দিকে ঝোঁক দেখা দেয়।
শিশুকে এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পিতামাতার উচিত ছিল তার আত্মবিশ্বাস বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা। উদাহরণস্বরূপ (তবে এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়):
ক) গোপনীয়তা রক্ষা করতে শেখানো: যখন সে গোপন কথা লুকিয়ে রাখতে শেখে এবং ফাঁস করে না, তখন তার ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি পায় ও শক্তিশালী হয় এবং ফলে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
খ) রোজা রাখার অভ্যাস করানো: যখন সে রোজায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকে, তখন সে বিজয় ও আত্মার উপর জয়ী হওয়ার আনন্দ অনুভব করে। ফলে তার ইচ্ছাশক্তি জীবনের মোকাবেলায় শক্তিশালী হয়, যা তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
এর পাশাপাশি পিতামাতার উচিত ছিল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং নিরাময়মূলক উপায় গ্রহণ করা, যাতে শিশুকে হীনম্মন্যতার অনুভূতি থেকে মুক্ত করা যায়। এই প্রবণতার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: অবজ্ঞা, অপমান ও উপহাস। যেমন ভাই-বোন ও আত্মীয়দের সামনে, এমনকি কখনো কখনো বন্ধুদের সামনে বা এমন অপরিচিত মানুষদের সামনে যাদেরকে সে আগে কখনো দেখেনি। এমন পরিবেশগুলোতে তাকে কষ্টদায়ক শব্দ ও খারাপ উক্তি দিয়ে ডাকা। এতে সে নিজেকে হেয় ও অপমানিত মনে করে। ফলে তার মধ্যে মানসিক জটিলতা তৈরি হয় যা তাকে অন্যদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের দৃষ্টিতে দেখতে এবং জীবন থেকে পালিয়ে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে প্ররোচিত করে।
যদিও পিতামাতার মুখ থেকে শিশুর প্রতি কষ্টদায়ক শব্দ বেরিয়ে যাওয়া কোনো বড় বা ছোট অপরাধ সংশোধনের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তবুও এই অপরাধ সংশোধনের পদ্ধতি হিসেবে এটি উপযুক্ত নয়। কারণ এটি শিশুর মানসিকতা ও ব্যক্তিগত আচরণে মারাত্মক প্রভাব ফেলে, তাকে গালাগালি ও অশ্লীল ভাষায় অভ্যস্ত করে তোলে এবং মানসিক ও নৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেয়।
এই প্রবণতার সর্বোত্তম চিকিৎসা হলো: শিশু যখনই ভুল করে তখন তাকে নম্রভাবে সেই ভুলের প্রতি সতর্ক করা এবং সেই ভুল এড়ানোর যুক্তিসঙ্গত কারণ তার কাছে উপস্থাপন করা। পিতামাতা যেন উপস্থিত লোকজনের সামনে তাকে ধমক না দেন বা ভর্ৎসনা না করেন। প্রথমতঃ তার সাথে সংশোধন ও পরিচর্যায় উত্তম পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আর সেটা হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংশোধন, শিক্ষা ও বক্রতা সংশোধনের অনুকরণ করে। কারণ শিশুর জগৎ অত্যন্ত সংবেদনশীল, দ্রুত প্রভাবিত হয়, তীব্র আবেগপ্রবণ, অল্প বোধশক্তিসম্পন্ন এবং সামান্য কৌশলী। শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা তার জীবনের সমস্ত পর্যায়ে তার ব্যক্তিত্ব নির্মাণের প্রথম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।